মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ… ইরানে (Iran) হামলা, পাল্টা মিসাইল আক্রমণ, একাধিক দেশে সেনাঘাঁটিকে উত্তেজনা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।
তেহরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর
খামেনেই ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বময় নেতা ছিলেন। ইরান এই হামলাকে কাপুরুষোচিত বলে ব্যাখ্যা করেছে। ইরানের সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, এই হামলায় খামেনেই ছাড়াও মৃত্যু হয়েছে তার মেয়ে, জামাই, নাতনি, বৌমার।
ইরান তিন সদস্যের একটি পরিষদ অস্থায়ীভাবে সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতা গ্রহণ করে, যতক্ষণ না স্থায়ী উত্তরসূরি নির্বাচিত হন। ১৯৮৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা খামেনেইর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইরান এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটে প্রবেশ করেছে।
পশ্চিম এশিয়ায় জারি অশান্তি ও হিংসা। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের প্রধানের মৃত্যুর পরে নয়া প্রধান নিয়োগ করা হয়েছে। আর এরপরই নতুন করে ইজরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে মিসাইল হামলা চালাতে শুরু করেছে ইরান। এই আবহে ইরান দাবি করল, তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে কুয়েতে মার্কিন নৌঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। এতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যু হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ‘ব্যক্তিগত বন্ধু’ বললেন নেতানিয়াহু
ইরান এবং ইজরায়েলের মধ্যে এই সংঘাতের আবহে তেল আবিবগামী এয়ার ইন্ডিয়ার উড়ান মাঝআকাশ থেকে ফিরে আসে ভারতে। ইরান এবং ইজরায়েল উভয় দেশই তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। বিশ্বজুড়ে বহু উড়ান সংস্থা তাদের উড়ান বাতিল করে। জবাবি হামলায় ইরানের তরফ থেকে মিসাইল ছোড়া হয় পশ্চিম এশিয়ার ৬টি দেশে। কাতার, সৌদি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে বিস্ফোরণ শোনা যায়। বাহারিনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও আছড়ে পড়ে ইরানি মিসাইল। এছাড়াও ইজরায়েলের বহু জায়গায় হামলা চালায় ইরান।
বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রথম বড় স্ফুলিঙ্গটি জ্বলেছিল ২০২২ সালে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। চার বছর পেরিয়ে গেলেও এই যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই; বরং এটি এখন পরাশক্তিগুলোর মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ন্যাটো ও পশ্চিমা দেশগুলোর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা ইউক্রেনকে টিকিয়ে রাখলেও, রাশিয়া তার অবস্থান থেকে এক চুলও সরেনি। উল্টো এই যুদ্ধ বিশ্বকে স্পষ্টভাবে দুটি মেরুতে ভাগ করে দিয়েছে। এই সংঘাতের জেরে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের যে প্রচ্ছন্ন হুমকি বিশ্ববাসী দেখেছে, তা স্নায়ুযুদ্ধের পর আর কখনো দেখা যায়নি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই মধ্যপ্রাচ্য পরিণত হয়েছে নতুন এবং সবচেয়ে ভয়ংকর রণাঙ্গনে। কয়েক দশক ধরে চলা ‘ছায়াযুদ্ধ’ এখন আর ছায়ায় নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে খোদ ইরানের রাজধানী তেহরানে হামলা চালিয়েছে। জবাবে ইরানও মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থে সরাসরি মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং মানবিক সংকট পুরো আরব বিশ্বকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। লোহিত সাগরে হুথিদের আক্রমণ বৈশ্বিক বাণিজ্যের টুঁটি চেপে ধরেছে। এই বহুমুখী সংঘাত এখন আর কেবল ফিলিস্তিন বা ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে পরিণত করেছে। রাষ্ট্রপতিকে সরানোর গভীর ষড়যন্ত্র করেছিলেন ইউনুস
ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে এশিয়ার পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। চীন-তাইওয়ান উত্তেজনা: তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনা যেকোনো সময় বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নিত্যদিনই মহড়া চলছে।
কোরীয় উপদ্বীপ: উত্তর কোরিয়া ক্রমাগত তাদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইলের পরীক্ষা চালিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের জন্য বড় হুমকি তৈরি করে রেখেছে।
ওদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে আফগানিস্তান। এরই মাঝে বাংলাদেশে, সেদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্র্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার তথা দূত প্রণয় ভর্মা।
১৯৭৯ সাল থেকে আমেরিকাতেই রয়েছেন ইরানের নির্বাসিত যুবরাজ। ওই সালে তেহরানে ইসলামিক বিপ্লবে তাঁর বাবা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরই ইরান থেকে নির্বাসিত হন পহেলভি।
১৯৭৯ সালে রাজতন্ত্র-বিরোধী বিপ্লবের সাক্ষী হন ইরানের মানুষ। পহলভি রাজবংশের শাসক শাহ মহম্মদ রেজ়া পহলভিকে সরিয়ে খোমেইনির নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে ইসলামিক রিপাবলিক সরকার। তবে এই বিপ্লবের বীজ বোনা হয়েছিল অনেক দিন আগে থেকেই। ইরানের রাজবংশের প্রতি সাধারণ মানুষের অসন্তোষ থেকে জন্ম নেয় বিপ্লব।
’৭৮-এর শেষের দিকে ‘চিকিৎসার কারণে’ ইরান ছাড়েন রেজ়া পহলভি। তার পরেই ইরানে ফিরে আসেন খোমেইনি। পতন ঘটে পহলভি বংশের শাসন।
১৯৮৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা খামেনেইর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইরান এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটে প্রবেশ করেছে।
খোমেইনি এবং রেজ়া পহলভির বিরোধ ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের মূল কারণ। ১৯৭৮ সাল জুড়ে ইরানে নানা দিকে বিক্ষোভ, অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ইরান থেকে রাজপরিবারকে উৎখাত করার এই বিপ্লবকে সমর্থন জুগিয়েছিল বিভিন্ন বামপন্থী এবং ইসলামপন্থী সংগঠনও।
গত বছর ২৮ ডিসেম্বর নতুন করে ইরানে আন্দোলন শুরু হয়।
৩৭ বছর পর অবশেষে মুক্তি পাচ্ছে রজনীকান্ত-শত্রুঘ্ন-হেমা,অমরীশ পুরী অভিনীত সেই ছবি
বিক্ষোভকারীদের দাবি, শাসনক্ষমতায় পরিবর্তন। তাঁদের দাবি, ইসলামিক রিপাবলিক ব্যবস্থার অবসান।
ইরানের এই আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করতে শুরু করে খামেনেই প্রশাসন। ক্ষমতাচ্যুত রেজা শাহ পাহলভির পুত্র ‘যুবরাজ’ রেজা শাহ আমেরিকা থেকেই আন্দোলনে মদত দেওয়া শুরু করেন। ইরান সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়াতে শুরু করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। ইজ়রায়েলকে সামনে রেখে ইরানকে চাপে রাখার কৌশল নেয় আমেরিকা। ট্রাম্প প্রশাসন চায়, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করুক। যদিও খামেনেই প্রশাসন জানায়, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। আমেরিকার সঙ্গে পরমাণুচুক্তি নিয়েও টালবাহানা চলছিল। তার মধ্যেই শনিবার থেকে ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকা। পাল্টা আক্রমণের পথে হাঁটে ইরানও। সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় খামেনেইকে। তবে শেষরক্ষা হয়নি।
দুবাই কেবল একটি বিমানবন্দর নয়, এটি ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে দীর্ঘ দূরত্বের উড়ানের মূল মেরুদণ্ড। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অধিকাংশ বিমান রুশ আকাশপথ এড়িয়ে চলে। ফলে ইউরোপ থেকে এশিয়ায় যাওয়ার বিকল্প পথ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধের জেরে সেই করিডোর এখন জনশূন্য।
দুবাই বিমানবন্দরের এই অচলাবস্থা কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর কম্পন অনুভূত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।